Thursday, 14 February 2019
উত্তরায়ণের কবিতা ৯

খিদে উপাখ্যান
–উমা মন্ডল
চৈত্র এসে গেল
কোকিলন্ঠী বাতাস বয়ে যায় ,
উথলে ওঠা ভাতের ফ্যানের মতো দাবদাহের প্রকট
এখনও চোখে পড়েনি ,
উট দরজায় দাঁড়িয়ে
চৌষট্টি ছকের নদী ও পার্বত্য জীবন এগিয়ে যায় ।
রাস্তাও এগিয়ে চলে ধুলা তার যন্ত্রণা সকল নিয়ে ,
মধ্যবিন্দুতে বসে থাকা ভিখারীর সন্তান
লজেন্সের শুকিয়ে যাওয়া প্যাকেট নিয়ে সতর্ক করে !
দিনকাল ভালো নয়
পাপের ঘড়ার প্রায় জবুথবু অবস্থা ,
ঠাকুমার মুখে কবেই শুনেছিলাম চার – পো হতে বেশি দেরি নেই
তারপর অনেকগুলি অমাবস্যা ও পূর্ণিমার কোটাল এলো ভাটিয়ালী বুকে ,
খাদ ও শীর্ষদেশ একটু নড়েচড়ে উঠলো
তৃতীয় নয়নের স্রোত একবার জেগে উঠেই ঘুমিয়ে পড়লো ।
কালঘুমের অসুখ এভাবেই ছড়িয়ে পড়েছে
হৃৎস্পন্দন থেকে মেঝেতে ,
আজকাল কেউ লাল রং লাগায় না
সর্বত্রই মার্বেলের চকচকে উপস্থিতি ,
হেঁটে যাওয়া পিঁপড়েরা পিছলে যায় এই ধরাধামে
ওদের জীবন – পঞ্জিকা আর অনুসরণ করতে পারি না ।
তাই শালপাতা নিয়ে বসে থাকি শূন্যের পাশাপাশি
এক নিঃস্ব ভিখারী আমি ,
ঝুলি নিয়ে এসেছি উলঙ্গ পায়ে , এক মুঠো চাল দিও মাগো
অন্নপূর্ণার বাড়া ভাতে পাশাপাশি খেতে বসি
আমি আর ভিখারীর অষ্টম সন্তান .
(ছবিঃ শেইলা নীলে)
উত্তরায়ণের কবিতা ১০
ব্যাধি
-শিবু মণ্ডল
গোপনে কেটে গেছে লোহা
চুরচুর লোহাতে
যন্ত্রের তবু বিষ নিয়ে কারবার
ক্ষত নিরাময়ে, মাত্রায় সাজিয়ে তোলা রূপ!
এ কৌশলরীতি, হাঁটাহাঁটি আদিকাল হতে
তুমি দিয়েছিলে। আমি গ্রহণে অক্ষম বলে
নীল হয়ে ওঠে কণ্ঠ
শূন্যের উপর শূন্য স্থির হয়ে দাঁড়ালেও
পূর্ণাঙ্গ অক্ষরেখাটি তবু অবিচল
শাসনের ইতিহাস ভুলে তবু রাজদণ্ড হাতে নিতে
গেলে এক এক করে শাটার পড়ে যাবে শহর জুড়ে।
সাদা রঙের দিস্তা দিস্তা পাখি কত উড়ে গেছে
সবুজ খেত ছেড়ে, হলহলে নদী ফেলে
আজ আমি যান্ত্রিক হয়েছি যন্ত্রের কাছে
আবহমান কৃষকের মত ক্ষুধা সইতে পারিনি বলে
মুষল পর্বের শুরুতেই নীল পাতা জুড়ে অক্ষর
মুষড়ে পড়ে। দেবনগরীতে আজ মহা উৎসব
নিজের পোষা পাখিটিকে নিজেই মেরেছে যে শবর
তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে উদ্যত সব
পাতার পর পাতা উল্টে দেখি, পড়ার চেষ্টা করি
ব্যাধেরও তো ব্যাধি আছে! সেই বোধ থেকেই পাখিটি ফিরে আসে
ফিনিক্স হয়ে। আমরা তার আত্মা খুলে খুলে দেখি
নাও আজ বিশ্বযজ্ঞে উৎসর্গ করো পাখিকে
(ছবিঃ অশোক রেবাঙ্কর)
উত্তরায়ণের কবিতা ১১

যথার্থ মেয়েটি যেন চন্দ্রবোড়া
-প্রদীপ চক্রবর্তী
এক।
পোষা বীজ ও কাদায় মেখে দাও | বীজ শুধু এমন কিছু ,
রক্তপ্রণালী থেকে সমুদ্রের দিকে যেতে যেতে যা হয়েছে মৎস্য ...
এমন প্রেম ও বৈরী | শস্ত্রপচারে অন্ধকার |
এমন হাত মিথুন প্রক্রিয়া | তার মন্থন দুদিকেই |
বৃষ্টি না অশ্লীল শব্দ খেচর ? বেশ মেঘ করেছে |
সাতসকালে রাঁধুনির ছোট মেয়ে ওই নৈঋতে জং ধরা | পেরেক বাক্সসমেত ভুলভাল কিছু দিয়ে গেলো |
শরীরের নাম : বিন লাদেন | মায়াময় সৌরসন্ধানী ঈশ্বর |
আরো কারণ আছে | আরো হারানো স্বপ্নের কারণ ...
প্রাচী বীজে এখানে এটিই নিয়ম | ছলা পশমে আঁধারকলা |
নিষিদ্ধ স্তরে ভোরের রস খেতে জড়ো হয়েছি |
দূরে কোথাও মিহি ঠুনকো মেয়েটির ছোট ছোট বুকের মধ্যে কীট বোনার ঘর ...
দুই ।
পরম সলোমন | অতঃপর মাংসের স্বাদ নোনতা |
প্লেট নামিয়ে তাকাচ্ছো | সেই হাওয়ার মেয়েটি একোয়ারিয়ামের ভেতর বিবিধ মাছের স্থানীয় অস্বাস্থ্য ...
সেই মহাভোজের দৃশ্যটি চোখে ভাসে | বিষণ্ণ শাড়িবিজড়িত সুদূর সুপ্ত | তোমার নিদ্রায় যেন ব্যাঘাত না ঘটে এই ভেবে শরীর থেকে মন খসে | ফুঁ লাগে জীপের ঝোড়ো হাওয়ায় | রোজই এক পা , দু 'পা গ্যালপিং | তেমন কিছু নয় , অঙ্ক মিলিয়ে শরীরে তার জায়গা খুঁজে নিতে | ফোঁটা দু ফোঁটায় দু ' হাত ভরে যায় | রক্ত বিন্দু সন্নিহিত ক্যাসিনোর সর্বশেষ আমিষ | দন্ডচারী দু 'ঠোঁটঅলা পাখি আত্মহত্যাকালীন সরঞ্জামসমূহ নিয়ে এলো |
চিবুকে পড়ন্ত তিল | সৈকত ময়ূরের মোহ |
অলীক আপেল খাবার দৃশ্য .......
সর্বস্বান্ত ফুরিয়ে ঈষৎ জাদুকর |
গমনে বেশ্যায় |
হতে পারে ভাঁড় ......................!
(ছবিঃ লরা গোমেজ)
উত্তরায়ণের কবিতা ১২

ছই
-সু চক্রবর্তী
আমার আষ্টেপৃষ্টে জন্মসাপ
জড়িয়ে গেলে বাবা আর প্রেমিককে
গণিতের এক সূত্র বলে মনে হয়।
বাবা অতীতের হেঁশেলে ডাঁই
করে রাখা দিস্তা কাগজের মতো
কালি পড়া বারণ।
প্রেমিক কখনো জবুথবু কখনো এককৌটো
ভাঙা সসুপুরি
দাঁত ভাঙবে তবু খয়েরসুখ!
বাবা প্রেমিক একই বর্গের
চতুর্ভূজ
একটি আরেকটি ছাড়া
অসম্পূর্ণ; ছই ছই
(ফোটোঃ গুইদো মোকাফিকো)
উত্তরায়ণের অনুবাদ কবিতাঃ ফিলিপাইন্স থেকে আইভী আলভারেজ
গোপন বোন
-আইভী আলভারেজ
উপত্যকায় ও হাজির হল, ভোরের দু'ঘন্টা পরে। ওর চলার ছন্দে রাতপোশাক দুলছে, যেন পাহাড়ে গলন্ত সূর্যের সোনা, কুয়াশামাখা গোলাপ। ও যেখানে দাঁড়াল, শাদা এক স্তম্ভ উঠল সেখানে, এবং ওর বিবর্ণ ঠোঁটে নীল দাগ, চুলে অন্ধকার প্রপাত। ওর দিকে ঘুরে তাকাতে গিয়ে, শীত ছুঁয়ে ফেলল আমার তলপেট, আমার জঙ্ঘা। এক মিনিটে ওর এক বছর বয়স কমে গেল। তুমি যাচাই করতে পারো। রাখো, ঘড়ির কাঁটা ওর তর্জনী আর অঙ্গুষ্ঠের মধ্যে রাখো, পিছনের দিকে সরাও। ওর পোশাক ছোট হচ্ছে, চুল বাড়ছে, ত্বক টানটান হচ্ছে, পুষ্ট হচ্ছে, সুডৌল, বুকের উচ্চতা, কোমরের উচ্চতা, হাঁটুর উচ্চতা। ওর ম্লান মুখ আমাকেই ছিঁড়ে ফেলল। তারপরে ও শুধুই কাপড়ে-জড়ানো এক প্রফেট, তারপর ক্ষুদ্রতম ভ্রূণ, তারপর একটা দাগ। ওর কোন নাম ছিল না।
পরিচিতি- আইভী আলভারেজের জন্ম ফিলিপাইন্সে হলেও বেড়ে ওঠা এবং পড়াশুনো তাসমানিয়ায়। এরপর কিছুকাল বৃটিশ দ্বীপপুঞ্জে বসবাসের পর তাঁর বর্তমান ঠিকানা নিউজিল্যন্ড। শূন্য দশকের শুরু থেকেই তাঁর লেখালিখির শুরু। এযাবৎ তাঁর পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ এবং একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে।
(অনুবাদ- সম্পাদক, উষ্ণিক)
(ছবিঃ কবির ব্যক্তিগত ব্লগ)
Sunday, 13 January 2019
হিমেল মাসের কবিতা ১

নিশিডাক
-সোনালী মিত্র
দেবোত্তম ,তোর বৌটা এত সুন্দর কেন!
তোর কর্কটে ভর সন্ধ্যায় বউকে একা কেন ওষুধ কিনতে পাঠাস!
জানিস না , ওষুধের ভিতরে আস্ত মনখারাপ ভরা থাকে
জানিস না , নিশিহায়নার চোখে রিপুভুত থাকে
খোলা বেণী পেলে অকস্মাৎ জাগ্রত হতে পারে !
#
মাৎসর্য সরোবরে ঝমঝম ঢেউ উঠলে , তোর বউয়ের
শাঁখাপলা পরা নরমহাত দুটো অযথাই মোম হয়ে গ'লে পড়ে
পুরুষশঙ্খে , উত্তাপে বেজে ওঠে অনাদি শঙ্খ ,
ভদ্রতা-টদ্রতা লাথি মেরে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারে
অথচ , ওষুধ নিয়ে ঘরে ফেরাটুকুই তোর সান্ত্বনা ।
#
বিছানায় পড়ে থাকা তোর শরীরটাকে ক্ষমা করি বলেই
শূন্যদের ঘরে প্রেমকে পাঠিয়ে আক্রমণাত্মক একটা বৃষ্টি
পাঠাতে চাই তোর বউয়ের বুকে , তোর বউয়ের
শ্বাসের ওঠাপড়া অত্যান্ত জরুরি তোর সুস্থতার কাছে
ওষুধের চেয়ে কার্যকরী উপকরণ নিজের চোখে নিজের পতন দেখা ।
#
তোর সুন্দরী বউকে এখন হিংসা হয় না , করুণাও নয়
ওষুধ নিয়ে ঘরে ফেরা হাত দুটোকে অন্নপূর্ণা মনে হয়
তোকে , ঠিক বিদূরের মতো লাগে , তোর তৈরি নাটকের চরিত্ররা
তোকে অবজ্ঞা করে যে পালাটি করছে , তুই তার শুধুই দর্শক
তোর রোগটিকে নিরোর বেহালার মতো মনে হয়
( ছবিঃ মরিৎজ কর্নেলিস এশার )
Subscribe to:
Posts (Atom)
