Thursday, 12 April 2018

মধুমাসের কবিতা ৬




জোনাকি ১
                 -পিয়ালী বসু ঘোষ 

বিচ্ছেদ ,রিপু ,চোখের জল
সবমিলিয়ে একটা মনখারাপের রাতে
ফ্লাইংকিসে বেবাক বোকা বনে যাওয়া সওদাগরি ঢেউ
নীলবিষে জর্জরিত কুণ্ঠা
এক কাপ চায়ে ভিজিয়ে খাচ্ছে চাঁদরঙা বিস্কুট
মাঝপথে নাবিক মেতেছে গোপন অ-সুখে
হাতড়ে বেড়াচ্ছে অন্তর্বাসের নিচের লালচে তিল !
আমি একটা গোটা মরশুম পার করে
ক্লান্ত আমার হাইরাইজের কার্ণিশে
অন্ধ জোনাকির সাথে লুকোচুরি খেলছি
অহর্নিশ শুধু
নিশি ডাকছে ,নিশি ডাকছে ........

জোনাকি ২

যেমন করে একটু একটু করে সিঁড়ি ভাঙ্গি
তেমন করেই বিপন্ন যৌবন ভাঙছে
বর্ষীয়ান জোনাকি খুবলে খাচ্ছে মন,সময়,শিশির
''
শুকনো পাতায় মর্মর ,দেখি
তোমার ছায়ারা দীর্ঘ হয়েছে এতদিনে
ডানাছেঁড়া জোনাকি পথ দেখাচ্ছে তোমায় ,ফেরার
"
দুলে উঠছে পাইনের বন ,মূর্তির বাংলো
একলা নদী আর শীত রাতের কনসার্ট
তোমার একাকার মন,বেসামাল পথভুল
আমাকেই খুঁজেছিলে কি ?
সে রাতের সাক্ষীও জোনাকি !

জোনাকি ৩

ছেঁড়া ঘুড়ির মত কেটে যাচ্ছে ছোটো একটা ব্যক্তিগত দিন
পোষা খরগোসের পায়ে নরম রোদ্দুর ছুঁয়ে গেছে বুক পকেটের হলুদ দুপুর
ডানা ছেঁড়া ফড়িংএর বিদ্রুপ ভালোবাসা শব্দটাকে ফর ফর করে হাওয়ায় ওড়াচ্ছে
শারীরিক প্রতিষ্ঠান চন্দন স্নানে সূচী হবার পর
চিতার আগুনে শরীর সেঁকে নিচ্ছে একমুঠো জোনাকি
তোমার অণুগল্পের অভিসন্ধিমূলক চরিত্রগুলোর ইটচাপা অভিমান
আমাকে এলোমেলো করে দিচ্ছে


(ছবিঃডেভিড গাজদা) 

মধুমাসের কবিতা ৫

Image result for abstract  aztec art


অন্তরাল
          -সুমন সাধু

জলের রং কী? জলের স্বাদ কেমন? এতকিছুর মধ্যেও আমরা জলের আয়তন নিয়ে অলীক মাথা ঘামাচ্ছি।

ও দেশের শিশুরা রোজ কাঁদে আর জেনে যায় কান্নার স্বাদ।
কান্না গলে নরম হয়। বড় নোনতা হয় চুমু খাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তের ঠোঁট।
এক বাবা তার বাচ্চাকে নিয়ে বাঁচার পথে পালিয়ে যাচ্ছেন আর ভাবছেন কালকের জন্মদিনটায় সে অন্তত বাঁচুক। বেঁচে যাক লোল বৃদ্ধ রাজনীতি।


আমরা কেউ সিরিয়া নিয়ে ভাবছি না। অথচ জন্মদিনের কেকে ছুরি বসাচ্ছি রোজ।

( অ্যাজটেক প্রত্নচিত্রের অনুপ্রেরণায় আলেক্সান্ডার আর্সানস্কি) 

মধুমাসের কবিতা ৪

Image result for abstract inca art


পাহাড়
          -শমীক ষান্নিগ্রাহী

১।
লম্বা ঘুমের জন্য
আমার ভীষণ প্রিয় একটা রাত
গল্পের মত সাজিয়ে নিচ্ছে নিজেকে
এসব লিখে ফেলে বেড়াতে যাওয়ার কথা ভাবি
কেউ মনে রাখবে না শীতের দিনগুলি

তার আলো কমে আসে বিকেলে

রাস্তার হদিশ পেয়ে
পাতার পর পাতা শুধু কুয়াশার ভেতর . . .


২।
কত ডাকনাম মনে পড়ে কুয়াশার
আপেল রং এর সাথে বিকেলের সম্পর্ক
কথা বাকী আছে বলে
দাঁড়িয়ে পড়ে শীত . . .
অপেক্ষার অনুবাদে সহজভাবে তাকিয়ে

এখান থেকে আমরা হাঁটা দিই পাহাড়ের দিকে

(ছবিঃ ইনকা প্রত্নচিত্রের অনুপ্রেরণায় জিওর্জিয়ানা রোমানোভনা) 

মধুমাসের কবিতা ৩

Image result for abstract ancient african art

এইসব চুপ থাকা 
                        -রঙ্গন রায় 

চুপ করেছি , শান্ত হতে পারছি কোথায়?
অথচ দেখেছি
অসুস্থ বাড়িতে কোনো অসুখের গন্ধ নেই।
ওহে বাদামী মেয়ে , তোমার দিকে দৃষ্টি দিইনি কখনো
তুমি দিদিমণির মত ভালোবেসেছ শাসনের আড়ালে ,
চশমার আড়ালে -
বলেছো , বাবু ফোন করবে তো? আজ কথা বলবে তো?
আমি বারবার মানুষকে উপেক্ষা করতে ভালোবেসেছি
দেখিনি তার পায়ের ছন্দে 'মরণ তুহু মম শ্যাম সমান' ...
আসলে এতকাল চুপ করে ছিলাম কথা বলবো বলেই


(ছবি ঃ আফ্রিকান প্রত্নচিত্রের অনুপ্রেরণায় ফতেমা আবদুল্লা আবুবকর) 

মধুমাসের কবিতা ২

Related image

হ্যামিল্টন গঞ্জ 
                     -শৌভিক দে সরকার

রোদ লিখি
রোদের কষ বেয়ে উপচে পড়ছে দুপুর
ঈশ্বরের বাড়িঘর লিখি
ঈশ্বরের ছেলেমেয়েদের হাতমোজা
বারান্দায় পড়ে থাকা খেলনা ভালুক
গর্ভবতী ঘুঘু লিখি
মূক ও বধিরদের বাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছে ঘুঘু
দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে
অন্য একটি খাবি খাওয়া দুপুরের দিকে

মাথা ঘুরিয়ে দেখছে
মাংস ঝরে যাওয়া অন্ধ দাঁড়কাক
কলোনির মোড়, দাবদাহের অতীত



(ছবিঃজেস বুর্ডা )

মধুমাসের কবিতা ১

Hyperspace free vector 2560x1600







বছর শেষের রিলে

-জয়ীতা ব্যানার্জী গোস্বামী 

     (১)
গোটানো সুতোর চাঁদ 
নিঝুম পাড়ার গতি ।একটি মাত্র মাকু ,সচল
নতুন গামছা বেচে কিনেছে কর্কট

ফুলে ওঠা চৈত্রমাস । ফের
চতুর্থটি এঁটে আছে অনায়াসে দ্বিতীয়ার কোলে
                  এবং বেলার শেষে,
ঘামের কলম ঝেড়ে আবেদন পত্র লেখা সেরে
বাড়তি গামছা বেঁধে ফেরে তার বেকার তিরিশ       

(২)
সারসের ভেজা ঘ্রাণ
ধূসরের আগে ও পেছনে অপয়া পালক বেছে
ভাসিয়েছে জলজ দেবতা । বাকিটুকু নৈবেদ্যর পাতে

তখনও জীবিত কেঁচো কিছু গড়িয়ে নেমেছে । ঠোঁটে
বিগত দিনের যত পরিযায়ী এঁটো ছুঁয়ে ছুঁয়ে
সাজিয়েছে ফুল । আজ বাসন্তীও যাবেন ভাসানে 








(ছবিঃ অ্যালবার্ট হফম্যান )

Friday, 9 March 2018

কুসুমাগমের আশ্চর্য ধারাবাহিকঃ হারিয়ে যাওয়া নব্বই- পর্ব ৮

Image result for abstract painting estonia

‘ফিরে পাওয়া মানে আবার হারানো শেষমেষ’
প্রলয় থেকে প্রলয়ে 
  - অনিন্দ্য রায়


বন্ধুত্ব হারায় না, নব্বই হারায় না ।
তবু, কেউ কেউ আজ আর আমাদের মধ্যে নেই । নব্বইয়ে কবিতাবন্ধু হারানোর যন্ত্রণা আমি প্রথম পাই তার কাছ থেকে ।
“ বিষণ্ণতা, ফিরে পাওয়া রুদ্রদিন
  আপনাকে যোগভাগের সরল নিয়ম
  শেখানো হলে শুরু থেকে  নষ্টামো
  সংক্রান্ত স্কুলিং-এর হাল হকিকত
  হানাদার বিশ্বাসগুচ্ছ হাতে নিয়ে
  মশারি গোটানোর প্রতিযোগিতায়
  বোনাসসমেত আইফেল প্রচ্ছদে
  জেগে থাকা আটজোড়া সিলভার দণ্ড
ও যাদুকরের আটরঙের কোমরবন্ধ
এবার আপনাকে শেখানো হবে
চিমনিবিহীন উড়ে যাওয়া এবং সরল
থেকে জটিলীকরণ, ফিরে পাওয়া মানে
আবার হারানো শেষমেষ
লাশঘরের দিবারাত্রি”
( ফ্রেম )
‘ফিরে পাওয়া মানে আবার হারানো শেষমেষ’, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া মানে ফিরে পাওয়া নয়; জীবন মরণের সীমানা ছাড়িয়ে চলে যাওয়া তার ।
ছিল কিডনির অসুখ, গ্লোমেরুলো নিফ্রাইট্রিস আর শরীরময় ছিল অভিমান, ভালোবাসা, বিরহ ।
একটা সময় এই শহরেই থাকত সে, আমাদের একই বন্ধুবৃত্ত, সাইকেলে ঘোরাঘুরি, হইচই । তখন কলকাতা মাঠের স্টার স্ট্রাইকার সঞ্জয় মাজীও তার বন্ধু । অথচ সে নিজে কোনো আক্রমণভাগেই নেই । নির্জনতার ব্যাধি একটু একটু করে গ্রাস করছে তাকে ।
“ প্রতিদিন কিছুটা ছায়ার লোভে সকাল সাড়ে ন’টা
   প্রতিদিন কিছুটা সুগন্ধের লোভে
  নাক উঁচিয়ে সকাল সাড়ে ন’টা ।

আমাদের হাজার বছরের পুরনো সম্পর্কহীনতায়
বার বার ফিরে আসে সকাল সাড়ে ন’টার ডকুমেন্টারি
সকাল সাড়ে ন’টা মানে আলতো করে
মুখ নামিয়ে শিশুপাঠ থেকে বিরতি
সকাল সাড়ে ন’টা মানে যাবতীয় ফাইমরমাস
সকাল সাড়ে ন’টা মানে নির্দিষ্ট জনের
চিন্তা জড়ো হয়ে থাকা একটা গোটা হৃদপিণ্ড
সকাল সাড়ে ন’টা মানে পদক্ষেপের হিসেবে ।

আমাদের সবার জন্য আবার কোন সুগন্ধ
উড়ে এলে সাজিয়ে ভরিয়ে রাখব
সবকটি আলো হাওয়াময় আসবাব

এখন থেকে সময়কে সাজিয়ে রেখে শুরু
করব সকাল সাড়ে ন’টা থেকে
সকাল সাড়ে ন’টায় আরেকটা দিনের দেহগন্ধ
সকাল সাড়ে ন’টায় আরেকবার সমস্ত কিছুর জন্য
মনখারাপের ছড়াছড়ি ।”
( মৌমিতার জন্য প্রথম কবিতা )
 সে প্রলয় মুখোপাধ্যায় ।
‘দুঃখ যন্ত্রণার কাটুম-কুটুম’ প্রকাশিত হয় ১৯শে জানুয়ারি ২০০২-এ, সে তখন আমাদের মধ্যে নেই। বইটি প্রকাশ করেন ‘কবিতা দশদিনে’র পক্ষ থেকে রাজকল্যাণ চেল। প্রচ্ছদ- ভারতের গুহাচিত্র অনুসরণে স্বরূপ চক্রবর্তী ।
এই তো কদিন আগে আরেক প্রয়াত কবির স্মরণসভা থেকে ফেরার সময় আমি রাজকল্যানদার বাড়ি থেকে বইটি সংগ্রহ করি। প্রলয়কে, কবি প্রলয়কে যেভাবে আগলে রাখতেন রাজদা আজও প্রলয়ের বই সেভাবেই যত্নে রেখেছেন । যেন এক প্রলয় থেকে অন্য প্রলয় অব্দি ।কেয়ামত সে কেয়ামত তক - এই রসিকতা ছিল তার সাথে আমার দেখা হলে, তারপর ছিল জড়িয়ে ধরা ।
“ পরিচ্ছন্নতা গিলে খায় সবকটি আতরসন্ধ্যা
  অক্‌টোপ্যাডে নৃত্যরত সৌন্দর্যসকল
  চাবিখোলা থেকে বৌখেলা মধ্যরাত্রির কনসার্ট
  অ্যাকাটিং  জোন থেকে বোতলঘর ও
মাইক্রোস্কোপিক ছিটকলে ঠাণ্ডামেশিন
বিশ্বনাগরিকের ফিতোমুক্ত ছুরি
  ঘুম নাস ধরলে আপনিই বিশ্ববাউল একসাথে বলুন
‘উই আর নট অ্যালোন’ ।”
( সেলিব্রেট )
এতদিন পর তার কথা মনে পড়ে; মনে পড়ে তাহার কথা । কোন সে প্রলয়ে চলে গেল !
হারানো বন্ধুকে নিয়ে সবকথা একবারে বলা যায় না, হয়ত কখনোই যায় না, তবু পরের সংখ্যায় আবার প্রলয় ।

(ছবিঃ অ্যান্ড্রেস সুতেবাকা)