Friday, 3 November 2017

আশ্চর্য্য ধারাবাহিকঃ হারিয়ে যাওয়া নব্বইঃ পর্ব ৪

Image result for light colour cubism painting

সে আলো, লাজুক নয়, সপ্রতিভ দ্যুতি 
                            -অনিন্দ্য রায়

 তখন আমার  শরীর ভালো নেই। সংজ্ঞা হারিয়ে পড়ে গেছি এক গুমোট সন্ধ্যায়। ওষুধ আর বাড়ির শাসনে আস্তে আস্তে রিকভার করছি। উঠতে গেলে মাথা ঘুরে যায়, বাড়ি থেকে বেরোনো মানা, সে এক অসহ্য জুলাই, ১৯৯৫ । সারাদিন বসে থাকি, একা, টুকটাক পড়ি, কনসেনট্রেট করতে পারি না, মাথা ভারী হয়ে আসে। সারাদিন এক অসহনীয় পাথর শরীরে নিয়ে বসে থাকি। বিকেলে ঝাপসা হয়ে এলে সে আসে। সে জয়, আমার আনন্দ। তারপর আমাদের গল্প, বাংলা কবিতা নিয়ে, পাশ্চাত্য সঙ্গীত নিয়ে। ওটুকুই আমার বেঁচে থাকা ওই দিনগুলিতে। জয় ওর ডাকনাম। শুভব্রত দত্তগুপ্ত। আমার  শহর ছেড়ে কলকাতা চলে যায় কিছুদিন পর, মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি ওর কাজের জায়গা ।এবং বিজ্ঞাপন। হ্যাঁ, কবিতা লেখে।
 ২০০০-এর বইমেলায় বেরোল ওর প্রথম কবিতার বই, লাজুক অন্ধকার।প্রকাশক প্রথম আলো, তরুণ চট্টোপাধ্যায়। দাম : পাঁচ টাকা। এক ফর্মার কাব্যপুস্তিকা ।
 উৎসর্গ : মা ও বাবাকে ।
নদীর গল্প বল... বারান্দায় মোড়া টেনে বসি
লাস্ট ট্রেন চলে গেছে শিবুদের পাঁচিল কাঁপিয়ে
পকেটে নারকেল ভাজা নিয়ে কাকদ্বীপে যেত যে কিশোর
আজকাল
সে রাসেল স্ট্রিটে পাথর ভাঙছে 
আমাদের পশমহীন জীবনে কেবল টায়ারের গন্ধ
শিরীষকাগজে এই অবিরাম মুখ ঘষা, হাড়ের নৃত্য দেখে
শিরদাঁড়া ভিজে যাওয়া মাঝরাত্তিরে
আমরা কি কোনোদিন মুখ তুলে চিল দেখবো না?
নদীর গল্প বল,
যে আমার অভিমানে জলছড়া দেয়। 
( সুজনেষু )
এমনই মায়াময় তার কবিতা। তার বই।প্রতিটি শব্দ পাঠককে আবিষ্ট করে ।  
আমাদের আলোচনায় প্রায়ই উঠে আসত ‘ট্রান্সক্রিয়েশন’ শব্দটি। নিজের চারপাশে দেখা দৃশ্যকে, ঘটনাবলীকে কবিতায়, ভাষায় আবার নতুন করে নির্মাণ করা। আর সে নির্মিতি কবির সম্পাদনায় হয়ে উঠবে এক নতুন দৃশ্য, নতুন ঘটনা, নতুন পৃথিবী – এই, ছিল আমাদের বোঝাপড়া তখন। 
শুধু শিল পড়ার শব্দ ।
জানলা দিয়ে ঘরে ঢুকছে কড়িবরগাহীন রাত
ডুবে যাচ্ছি অন্ধকার হাত রাখছে কোমরের নীচে
সমস্ত জীবন একটা কফিনের মধ্যে শুয়ে আছি,
শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যাচ্ছে লবণাক্ত মেঘ ।

পর্দা সরিয়ে আজ বাইরে তাকাও
সেই রাস্তা খুঁজে নিতে হবেই তোমাকে, যেখানে
রাতের সঙ্গে হোলি খেলছে চতুর্দশী চাঁদ । 
( পুর্বাচলকথা )
 কোথাও হোঁচট খায় না তার উচ্চারণ, সাবলীল। চিত্রকল্প থেকে চিত্রকল্পে অনায়াসে নিয়ে যেতে পারে আমাদের। তার চারপাশের বিনির্মাণ ও নবনির্মাণ এক সুর তৈরি করে, এক আলোছায়ায় প্যাটার্ন তৈরি করে চেতনায়।
তোষকের মধ্যে ঘন পূর্বজীবন 
সুষুম্নাপোকা জানু পেতে আলো ভিক্ষা করে ।
উঠে ডাঁড়ায় আসমানে

কড়িকাঠ ছুঁয়ে আছে সবুজ মিনার । দলবেঁধে
মেছুনীরা আসে
হৃৎপিণ্ড কাদা হয়, জন্মের প্রথম দিক অনেকটা
রুটির মতোন

চাঁদের চর্বি লেগে তৈলাক্ত মুখ । কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকে 
অন্ধকার পায়ের আঙুলে ।
শালিখের পাশে দিঘি, হলুদ কুশূল-মেঘ
ভিনিগার ঢালে ঈষদুষ্ণ চুলে 
( তৃণজন্ম )
রিয়েলিটি ও কল্পনা মিলেমিশে যায় তার লেখায়, নীচু স্বরে বর্ণনার মায়ায় সে আমাদের অন্য এক রিয়েলিটির মুখোমুখি দাঁড় করায়। 
দু’সমুদ্র আর্তনাদ ড্রয়ারের নীচে
দুটো পেন পরস্পর মাথা বদল করে । আবছা কিনারে দাঁড়িয়ে জলের কেশরে হাত
দিয়েছি, কখনো প্রহরী রহস্য টের পেয়েছিল। পিরানহা ছেঁকে ধরে নিখিল
কবজি । বুঝি, এক বালিশের হুল অন্য কানে পালক হয়েছে ।

প্রথমে সবুজ ছিল টুপিবোনা উল্‌ । তাঁবু ছেড়ে উঠে আসছে আপৎকালীন চোখ ।
নৌকো চালনায় যুবা দক্ষ নয় বলে গিরগিটি গায়ে ডিম পাড়ে – নিদ্রালু ডিম;
আমিষ শুক্রগন্ধে সন্তপ্ত হরিণপৃথিবী ।
( ডিম )
কলকাতা গেলে আমাদের দেখা হয় মাঝেমধ্যে। 
আমার মা যখন অসুস্থ নিজের কাজ শেষ করে দেখা করতে আসত ঠাকুরপুকুরে। তারপর রাত্রি যখন সান্ত্বনাহীন, ফিরে যেত সল্টলেকে। 
আমার জীবনের দুই চূড়ান্ত অসময়ে সে আমার পাশে দাঁড়িয়েছে, হাত রেখেছে কাঁধে।  
একদিন ক্যুরিয়ার একটা খাম দিয়ে যায়, খুলে দেখি কার্ড, বিয়ের কার্ড, জয়ের ।
তাতে ‘ দুই হাতে দুই মশাল দিও/ শান্তিও চাই অশান্তিও’ এই অমোঘ বার্তা মুদ্রিত।
নিজের কাজের জগতে পরিচিতি বাড়তে থাকে তার। গানে ও বিজ্ঞাপনে সে তখন রীতিমতো নাম, জয় দত্তগুপ্ত। 
আরেকটি কবিতার বই বেরোয় । 
তারপর?
লেখে না আর? পত্রপত্রিকায় দেখতে পাই না তো। 
কবিতা থেকে সরিয়ে নেয় নিজেকে। 
নব্বইয়ের এ এক প্রবণতা, লেখালেখি থেকে সহসা নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। অন্য কোনো মাধ্যমে ব্যস্ত হয়ে পড়া। 
জয়ের স্নগে ফোনে কথা হয়, কবিতার কথা উঠলে বলে, “ শুরু করেছি আবার”। 
হ্যাঁ, আমার বন্ধু আবার কবিতায়, স্বচ্ছন্দে, ঝকঝকে, আদ্যন্ত স্মার্ট শুভব্রত।
বলছি তো, একটুও লাজুক নয়, একটুও অন্ধকার নয়, আলোর আদর লেগে থাকে তার হাসিতে, তার কবিতায়। 

(ছবিঃ জর্জেস ব্র্যাক) 

Thursday, 2 November 2017

দেবদীপাবলীর কবিতা ১৮

Image result for abstract painting mongolia

অস্তিত্ব
         -অনিন্দিতা ভৌমিক

ঘুরে তাকানোর মতো কিছুই ফেলে যাচ্ছি না আমরা। শুধু বন্ধ আর খোলার মাঝে এই যে কণার স্রোত, সেটুকুই অবিচল পড়ে থাকে। পর্দার আড়ালে চরিত্রের গায়ে থাকে পুনঃপ্রকাশের দৃশ্য। অনেকটা গতিময়।জ্যান্ত।যেভাবে একাত্মবোধের আগে কখনো নিভে যেতে চাইতাম।শীতের ভেতর আঙুল রেখে দেখতাম কতটা রোমকূপ জেগে ওঠে। আলোর ভেতর কতটা পাক খায় এক একটা বিশেষ অনুভূতি।

তবে কি মৃত্যুর কথা বলছি? টকটকে লাল অবসাদের দিকে পা তুলে ভাবছি অন্যভাবে যোগাযোগের কথা। তোমার ঝুঁকে আসা মুখ অথবা ঋতুস্রাবের যন্ত্রণার কথা। 

আর একবারের জন্যে অন্তত দেখা হতে পারতো আমাদের।স্বাভাবিকতায় নিবিষ্ট হতে পারতো কিছু ব্যাখ্যাতীত অংশ।তীব্র আবেদনময়। ঘুরে তাকানোর মতোই দীর্ঘ।

(ছবিঃ ওয়াসিলী ক্যান্ডিনস্কি) 

দেবদীপাবলীর কবিতা ১৭

Image result for abstract painting india

লোনলিনেস
         -হাসান রোবায়েত 

বিষন্নতার ভেতর
একটি বাগান কীভাবে উদ্যাপন করে ফল!
এইসব বেঁচে থাকা ভালগার
অন্তিম লুপের সাথে দেখা হয় ভাষাটির
ঘুরে ঘুরে
অবিমিশ্র হাইফেন ফিরে আসে—

গমক্ষেতের পাশে গোলক-সূর্যোদয়
দূরপাল্লার এক সুইসাইডে
রঙ লাগছে
আর মালগাড়িটায় ভিজে যাচ্ছে
আমার লোনলিনেস—

ভাষা—অহেতুক অর্থের দিকে যেতে চায়!

(ছবিঃ মণীষা বেদপাঠক) 

দেবদীপাবলীর কবিতা ১৬

Related image

প্রতিসরণ
             -তন্ময় ধর 

 আলোকে না জানিয়ে খানিকটা খাবার আমি তুলে রেখে দিই। টাইমলাইনে কেউ এসে লিখে রেখে যায় ‘আমি শিশুর মতো থাকতে চাই’। সত্যিই তার গর্ভাশয়ে জটিলতা বাড়ছে। স্বপ্নের বাঁদিকে অন্যরকম হাঁটা শিখছি আমি
জলের শব্দে, বুদবুদে, বাস্তবতায় আবার পড়ছে আলো। মাংসের টুকরোগুলোয় মশলা মাখাতে মাখাতে তুমি রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইছো। হেমন্তের নতুন ভাতের ফেনা ঢুকে পড়ছে তোমার নষ্ট সংসারের ডি মেজরে
আজীবন যুদ্ধের পর তোমার অপেক্ষায় আলোর পিছু নিয়েছি আমি। আকাশের পুরুষচিহ্ন চোখের যন্ত্রণায় ডবল...ট্রিপল... বেনিয়াসহকলা। আমার সহনসীমায়ও বেনিয়ম ঢুকে যাচ্ছে। আমার হাতে-নখে-চামড়ায়-মুখগহ্বরে ক্রমাগত সুর বদলে দিচ্ছে আলো 

(ছবিঃ ড্যান ওয়েলিংটন)

দেবদীপাবলীর কবিতা ১৫

Related image

প্রতিক্রিয়া
           -অভিশ্রুতি রায়

তবুও বিকেল
বৃষ্টি নামার তাগিদ দিয়ে যেত
কত হাত ফসকানো মাছের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ হতে পারতাম
স্ট্রিট লাইটের নিজস্বতা
আর নিজের খনিজসম্পদ
কতটা রঙিন...
একটা চারাগাছ চেয়েছিলাম ঘুমের কাছে
অথচ স্তব্ধ আমায় পৃথিবী কিনে দিল

(ছবিঃ সের্গ উইয়াডার্নি) 

দেবদীপাবলীর কবিতা ১৪

Image result for wildfire abstract painting

লাহা ডুংরি
              -শৌভিক দে সরকার


একটি পা লিখলাম
পা-এর সমাহিত অর্থ লিখলাম
পা-এর জড়ো করা অধৈর্য, ছদ্ম পলাশ লিখলাম

মেঘের তির্যক লিখলাম
বসন্ত বিহীন মাটির সংঘাত লিখলাম
প্রতিস্থাপনের পর কীভাবে অতিক্রমণের
রাস্তাটি পাল্টে ফেলে চোখ
কীভাবে খুঁটে দ্যাখে অশ্রুসজল
মেঘগুলির নিচে উড়ে যাওয়া নশ্বর কাক

মেঘের বর্ণ লিখলাম
ফেরতযোগ্য একটি দিন
নখের আলস্যে গেঁথে যাওয়া ম্যাজিক ভ্যান

আগামী বছর আরও নিচে
নেমে আসবে মেঘ
পাহাড়ের গোড়ালির কাছে
আখের ক্ষেত আর নিয়ন্ত্রিত সেচখালের ভূমিকায়

(ছবিঃ ডেবরা হুর্ড)

দেবদীপাবলীর কবিতা ১৩

Image result for wildfire abstract painting

সমুদ্র
       -স্বাগতা সিংহ রায়

১।
উন্মাদ যার আছড়ানো
ফাঁদ পেতে ফ্যানা ধরা
দিলাম ঢেউ তার নামে-
পথ জুড়ে কত ভ্রমণ।

২।
জলজ দেহে এত কম্পন
ফাটল বুজিয়ে পরিবর্তন
তিমির টানে ট্রলার ডোবে
মৎসকন্যার মৃতদেহ ভরাট


৩।
বালু আঁচড়ে এত অস্থির
নোনা বাতাসে জীবিত স্বপ্ন
কিনারে এসে স্তব্ধ হয়
ঢিউ -এ যার লাশ হারিয়েছিল

৪।
হৃদ থেকে কয়েকটা ঢেউ
যে যাও,ফিরে এসো
যেমন করে জোয়ার ভাঁটা-
দুকলমে সমুদ্র বুনে ফিরে আসে।

(ছবিঃ উইলিয়াম অলিভার)