Saturday, 30 May 2020

হারিয়ে যাওয়া কবিঃ অমরশঙ্কর দত্ত













অমরশঙ্কর দত্ত 

(২০/১০/১৯৩৮ — ১৫/০৯/১৯৯৮)

 [অমরশঙ্কর দত্ত থাকতেন পুরুলিয়া জেলার মানবাজারে। সম্পাদনা করেছেন ‘জঙ্গলমহল’ পত্রিকা। প্রকাশিত বই ‘দিনকাল’ (‘তিন ভুবন’ সংকলেনের অংশ), ‘ভোটরঙ্গ’ (ছড়া), ‘নির্বাচিত কবিতা’।
 কবিপুত্র সন্দীপ দত্তর সহায়তায় অমর শঙ্কর দত্তর কয়েকটি কবিতা প্রকাশিত হল।
             : অনিন্দ্য রায়]

নাম

শুধু নাম মনে পড়ে
অঙ্কুরিত বীজ
চেয়েছিল রৌদ্র মাটি জল
পরিবর্তে
পেলো শুধু খ্যাত ও অখ্যাত কিছু নাম
নাম মনে পড়ে।

ডায়না

ডায়না বিষাদগ্রস্তা তাই পৃথিবীর শোক
ঝরে পড়ে
ডায়না বিষাদগ্রস্তা কুঁড়ি আর পাঁপড়ি মেলে না
রাজহংসীর মতো শুভ্র তবু শৃঙ্খলিত স্রোতধারা
সংবাদপত্র জানায় বলে, সকলেই জানি
ডায়না আজ ভালো নেই।
রাজপ্রাসাদের থামে কালোছায়া- শোকগাথা
গির্জার ঘণ্টায়
ডায়না কি নেপাল যাবে কিংবা গ্রীস
সমুদ্রবিহার চাই- নির্জনতম দ্বীপের
অঞ্জাতবাসের শুশ্রুষায়
পুনঃ সংস্থাপিত হবে তাঁর পূর্বরাগ, প্রেম?
ডায়না একান্তে আজ একা- একদিকে রাজপ্রাসাদের উঁচু থাম
গৌরবগাথা ধ্বজা আভিজাত্য
বিষাদসিন্ধুর মধ্যবর্তী তৃষ্ণার্ত মীন সাঁতার জানে না
সংবাদমাধ্যম আমাদের
শুধুমাত্র উপহার দেয়
কুন্তলঢাকা ডায়নার আধেক মুখ
নিপাট স্তন নাভি
ডুবন্ত নাবিক আমরা
তা থেকেই সমুদ্ভাসিত
আমাদের
সন্ধান সন্ধান।

দাহ

উপরে সুস্থির জল, নিচে ঘূর্ণি
দাম্পত্য কলহ।
বিস্তৃত উদ্যান পড়ে থাকে দূরে- পুষ্পহীন
উদয়াস্ত পরিশ্রমে জীবিকা সংস্থান
তবু অবাঞ্ছিত ঝড়- হিংসা ও সন্দেহ
শুন্য করে দিয়ে যায় পূর্ণ কলস
গুহাবাঘ, তাও কেন অরণ্যসঙ্কুল
ঘরে ঘরে স্বতঃস্ফূর্ত
একটি দাবদাহ
দাম্পত্য কলহ!

বীজ

অক্ষয়রানী খেজুরজুপি ভাসামানিক কেরলাসুন্দরী
কতো না বীজের নাম
কতো জাতি ও প্রজাতি
  তবু জাতিদাঙ্গা হয়না সেখানে।

অনুরূপ শিমুল ও পলাশ শাল পিয়াশাল
মহুয়া অর্জুন দেবদারু
পাশাপাশি, একই মাটি ও বৃষ্টিধারায়
বসবাস
জাতিদাঙ্গা সেখানেও নয়।

ভুমি থেকে অঙ্কুরিত হয় না বলে
মানুষেরা অন্যরকম।।

গাছ ও মানুষ

চেনা-শোনা-জানা জীবনের ভিতরে
আমরা বহন করি অন্যজীবন।

চেনার অন্তরালে অচেনা, মানুষের
অন্তরালে অন্য মানুষ
আত্মগোপনকারী মানুষের
অতর্কিত ও এলোমেলো আত্মপ্রকাশ

গাছেরা সে রকম নয়।
গাছের ভিতরে
রামের মধ্যে রহিম
আত্মগোপন করে থাকেনা

তাদের অযোধ্যা নেই-
রামজন্মভুমি নেই

গাছ প্রকৃত ঝড়ের মর্ম বোঝে
বোঝে বলে-
ঝড়ের পর বৃষ্টি
ধারাস্নান!

তোলা

আজকাল বিড়ালের মতো অনেক কিশোর কিশোরীকে
লাফালাফি করতে দেখি।
এর কোলে ও, ওর কোলে এ।

স্কুল বারান্দায় হাসপাতাল চত্বরে
ফাঁক-ফোকরে।

আবার অর্থ শিকারীর চোখ লক্ষ রাখে
আনাচে-কানাচে

পাকড়াও করতে পারলে, তোলা
আদায় করা যায়
হায় প্রেম, হায় শারীরিক অবাধ্যতা
শেষঅব্দি
তুমিও তোলার খপ্পরে।

Monday, 20 April 2020

বৈশাখের অনুবাদ কবিতাঃ পোল্যন্ড-আর্মেনিয়া থেকে তাতেভ চাখিয়ান



এক অচেনা মানুষের মৃত্যু
                       -তাতেভ চাখিয়ান 



একটি বিবর্ণ ছবি
যার এক সারিতে রয়েছে: একটি শিশু,
দুই মধ্যবয়স্ক পুরুষ এবং একজন প্রবীণ,
বলিরেখাঙ্কিত এক বৃদ্ধা
এবং একটি যুবতী মহিলা একটি শিশুকে অন্য হাতে চেপে ধরে আছে।
প্রতিদিনের দায়িত্ব নিয়ে ক্লান্ত, মৃতদেহগুলি
ছুটির পোশাকে মোড়া
একটি ব্লিচ সুগন্ধযুক্ত আঙুলে একটি বিবাহের রিং,
বাচ্চাদের মাথাভর্তি চুল
জীর্ণ পোশাক পরিষ্কারভাবে বাঁধা
আঁচড়ানো চুল এবং কাটা দাগ
আমি এই ফটোতে কাউকে চিনতে পারি না,
এগুলির যে কোনও একটির নাক আমার মতো।
জীবন - এটি তাদের যৌথ চুক্তি,
একটি ক্যামেরার সামনে একসাথে দাঁড়ানো।

মৃত্যু - আমার ব্যক্তিগত ফটো অ্যালবামে এই ছবির অস্তিত্ব।


(অনুবাদ- সম্পাদক)



বৈশাখের কবিতা ১১

Birbhum In Summer- Benode Behari Mukherjee - Bengal School Indian ...


জড়ো করা দিন
                  -নীলাব্জ চক্রবর্তী



মাংসের বাগানে আমি গান ভেবে
একটার পর একটা
বাদামী ক্যালেণ্ডারের ওড়াউড়ি
হরফ অর্থে খুব উদাস যা কিছু দৃশ্য হচ্ছে
ঘ্রাণ হচ্ছে
স্মৃতির বাইরে যেটুকু
পড়ে থাকা
শরীরের ভেতর একটা জড়ো করা দিন
মানে
ঠাণ্ডা একটা হাতল
শুধু জরিপ অবধি
এই যে আঙুলের ঘুম
নড়ে উঠছে
একটা চলমান কবিতায়...

(ছবিঃ বিনোদবিহারী মুখার্জি)

বৈশাখের কবিতা ১০

Benode Behari Mukherjee: Light and Shadows of an Artist's Life


অনুশাসন পর্ব : দুই
                         -নভোনীল চট্টোপাধ্যায় 
             
ঋণ করে রেখে যাই শব্দ, সংসার, সংলাপ
অন্দরমহলে বাজে এত সুর আর এত গান,
কার মতো এই সুখ? নির্ভীক পাতার চিৎকার
বোঝাতে না পেরে তুমি ভিজে পলিমাটিতে আঁচড়

হলুদ আর নিমপাতা হয়ে আমি জীবাণুনাশক,
এই দেশে শুয়ে আছি দাম্পত্য চর্চার আগে থেকে
তবু আমি বনাঞ্চলে মানুষ এনেছি প্রতিবাদে
সক্ষম, শিক্ষিত হাত বার বার ধুয়ে নিচ্ছি সাবানের জলে।

(ছবিঃ বিনোদবিহারী মুখার্জি)

বৈশাখের কবিতা ৯

Benode Behari Mukherjee - JungleKey.in Image


অসুখের দিনে
             -গৌরাঙ্গ মন্ডল



চিমটে কেটে দেখে নিই
আমি ঠিক মৃত না নিভৃত

মলিন কুয়াশ যেন ঈশ্বরের
নিজ হাতে বিছানো কফিন

ভেতরে কী ঝড় উঠেছিল?

বালিকা শহর কার আঙুলের ভয়ে
শামুকের মতো তার বুক ঢেকে নিল?






মিছে দোষ দাও, মিছে
ভর্ৎসনা করেছিলে তাকে

যাকে অপরাধ ভাবো, ভাবো
যার আশরীর নখ

মুখোশ সরিয়ে, দেখো, আমারই মতন
আসলে সে ভীতু এক লোক



ভয় খামচে ধরে আছে পৃথিবীকে

ওল্টানো জাহাজ থেকে যারা ফিরে গেল
তাদের ঘুমের মধ্যে বিষাদের সাথে
চোখ থেকে উঠে আসবে লবণ কণাও

অভয়, তুমিই নার্স
তাহাদের শুশ্রূষা শোনাও

(ছবিঃ বিনোদবিহারী মুখার্জি)

বৈশাখের কবিতা ৮


Benode BehariMukherjee | Untitled | MutualArt

সম্পর্ক
       -সম্পিতা সাহা

একটা যন্ত্রণা, প্রলুব্ধ বিকেলের মতো
বহুক্ষণ পেটের নীচে আটকে ছিল।
হাত দিচ্ছিলাম যতবার,
ততবারই কেমন তরল হয়ে
লেগে যাচ্ছিলো উলটোদিকের মানুষটার চোখেমুখে।

কাউন্টারে ভিড় জমছে ক্রমশ।
সিনেমাটা বড্ড ভালো হয়েছে শুনলাম।
নিজেদের সাথে মিলে গেলেই বুঝি
পর্দার রঙ উপাচার হয়ে যায়!

দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে গ্রীবা ভারি হয়ে ওঠে।
ঠাণ্ডা লাগে কানে।
মোহিনী মাছের মতো দেহ
শিহরণ থামিয়ে মন দেয় তলিয়ে যাওয়াতে।
হলের ভিতর সবার চোখে মুখে
একটা ধুসর গোলাপি রঙ...
এরমধ্যে তোমার হাসিটা
পুরোনো বাড়ির গোলমরিচ গাছের মতো
ভস্মসবুজ হয়ে
ফুরিয়ে যাচ্ছে না বদলে যাচ্ছে বোঝা যাচ্ছেনা...

যন্ত্রণা বহুক্ষণ একজায়গায় থাকলে,
শরীরেরই একটা অংশ মনে হয়।
সেরে যাক পুরোপুরি তেমনটা চাইলেও,
সেরে গেলে ফাঁকা লাগে কিছুদিন।
বিবর্ণ, ত্রিকালসিদ্ধ
আগামীজন্মগুলোয় যাতে একটা মহাসাগর
শুকিয়ে যায় চিরতরে
এইটুকু অন্ধত্ব বাঁচিয়ে রেখো মহাকাল...

মানুষে ঈশ্বরে সংসার নয়,
শুধু বোঝাপড়া হয়ে এসেছে সুনিবিড়।

(ছবিঃ বিনোদবিহারী মুখার্জি)


বৈশাখের কবিতা ৭

Benode Behari Mukherjee: Light and Shadows of an Artist's Life


অমরত্বের ভিতর মানুষ 
             -তন্ময় ধর 


যেখান থেকে অমরত্ব শুরু হয়, তার ঠিক পাশেই পড়ে আছে কয়েকটি কঙ্কাল
আমরা দেড় হাজার কিলোমিটার হাঁটব বলে নিজেদের সাজিয়ে-গুছিয়ে নিচ্ছি
উপবাস করছে এক দীর্ঘ গর্ভকালের আগুন
সাতটি জিহ্বার উপর ভর করে
পুড়িয়ে দিচ্ছে শিশুর খেলনা, মিছিমিছি দুধ, রক্তের দাগ

ঠিক যেখান থেকে অমরত্ব শুরু তার নীচে শুকিয়ে যাওয়া বাদামী মৃতদেহগুলোর উপর দিয়ে
পার হচ্ছে রঙবেরঙের চেরী, কাজু, চীজ, ক্ষীর, শাহি জাফরান মাখানো রেসিপির ভিডিও
পার হচ্ছে তীব্র হাসি, গনগনে লাল মাংসের যৌন সংলাপের অদৃশ্য তরঙ্গ
অতিরিক্ত আহার ও ফেসিয়ালের ভারসাম্য রক্ষা করতে না পেরে
কেউ অশুদ্ধ মা লাগিয়ে দিচ্ছে সন্তানের ঠোঁটে 'আনন্দধারা বহিছে ভুবনে'




(ছবিঃ বিনোদবিহারী মুখার্জি)