Tuesday, 10 October 2017

আকাশপ্রদীপের কবিতা ২০

Related image

পর্ণমোচী
            -অনিন্দিতা গুপ্ত রায় 

উদ্দেশ্য বা বিধেয় কোনোকিছুই
বিবেচ্য ছিলোনা সামান্য পথের তফাতে
পৌঁছনোর কথাও ছিলোনা
অনভ্যাসের চিহ্ন ক্রমশঃ সারিয়ে তুলছে
এই মরশুমী অসুখ প্রতিটি জুলাই থেকে
তুলে রাখার ছিল যেসমস্ত একটা জীবনে
কিরকম অগোছালো হয়ে আছে আসক্তিহীন
তাই পাঁজর অবধি গেছে তীর, তার নীচে
পর্ণমোচীর একা পাতা খসবার যত উদাস লিখিত

(ছবিঃ হ্যারি মুডি) 

আকাশপ্রদীপের কবিতা ১৯

Image result for abstract purple painting

আমাদের ধুলোবালি সংসার
                                  -জয়া গুহ(তিস্তা)

ঘুমিয়ে পড়লে, সে এসে দাঁড়ায় শিয়রে
উঠোন ঝাঁপিয়ে লাউমাচা, জানলায় উঁকি
টুসু ঘুমন্ত মুখে, বুকে মুখ গুঁজে
নাফিজ অজান্তে হাত রাখে সুরক্ষিত স্তনে! মা যে
কতকাল বুকে নিয়ে আছি,এইভাবে
টিনের চাল, ফুটো বেয়ে জল পড়ে দু-চার ফোঁটা
ঈদের চাঁদ আসা লুটোপুটি বিছানা এখন সপসপে
মাথায় ঠান্ডা হাত রাখি
কখনো শরীরের ওমে, কাঁথা বালিশের ভাঁজে জড়িয়ে নিই অপত্যস্নেহ
দুটো কচিমুখ,ঠিক মত ভাত পায়নি কাল থেকে
টানা জ্বরে কাঁপা ঠোঁটে খুব জোর সাবুদানা গরমগরম
আজ ও আসেনি কাঁটাতার পেরিয়ে কোনো খবর
বর্ডারের ওপারে লোক আনানেওয়া, চোরা পথে
নগদে টাকা মেলে, কিছু উপরিও
কানাঘুষো, ফিসফাস খেয়া ঘাটে
কারা যেন নিরুদ্দেশ, চুপচাপ
খবর আটকেছে বড় মানুষের দল
তারা নাকি  ছিল না কোনোখানে,
কোনো গ্রামে, তাই  কেউ হয়নি নিখোঁজ
টুসু,নাফিজের বাপ!
সেও নাকি ছিল না আদৌ
সেই আসে রোজ রাতে চাঁদ হয়ে,জল হয়ে দুচোখে গড়ায়...

(ছবিঃ ক্রিস্টিনা রোলো) 

আকাশপ্রদীপের কবিতা ১৮

Image result for abstract red painting

গান
     -কস্তুরী সেন

১/
জড়িয়ে ধরা রাত্রিভাষা, বাতাসে তানপুরা
তখন স্নান করার মতই ভোরের শরীর জাগে...
কে কাকে ভেদ করলে এলো অন্তরাতে আলো
বিজলি ঝলক দিলীপকুমার, মন্ মোহন আগে!

২/
বসে যাও আরও, খেয়ে যাও না গো রাতে!
নিতান্ত ক'রে বলা অসাধ্য, সারা সন্ধেটি ভিড়
মলয় আসিয়া কানে কহে গেছে প্রিয় কণ্ঠের নাম ;
আমরা দরদি, মহড়ায় সবে প্রেমে পড়া মেয়েটির...

৩/
এই পথে বৃষ্টি ছাড়া আর কিছু নেই
এই পথে বাড়ি ফিরছে একা ছাতা, আধাআধি লোক
অগাস্ট ছাতার নিচে এপ্রিলের সন্ধেবেলা, কেউ না দেখুক
শোন সখি বলি তোরে, আজ বলি তোরে
এপ্রিলের সন্ধ্যাটির বাকি অর্ধ এইমাত্র এসে নামল
রবীন্দ্র সরোবরে --

৪/
ওরা কিন্তু বন্ধুই দারুণ,
আর ওরা নজরুল, দিলীপকুমার, সাঁইতিরিশ সাল!
'কী সব মানুষ তখন রেডিওতে' এই করে দীর্ঘ রাত,
দুজনের দীর্ঘরাত বয়ে যায়...
জ্বলবার মন্ত্র দিলি, সামান্য মানুষ ওরা, না জ্বলে যাবে বা কোথায়!

(ছবিঃ ক্রিস ভীনেমান) 

আকাশপ্রদীপের কবিতা ১৭

Image result for abstract red painting

নাপাক 
              -তন্ময় রায়

শোয়ায় মাড় দিতে ভালো লাগে। কথার ঠিক কোথায় ও-কার লাগানো যায় জানতে গিয়ে ভাব হয় তোমার সাথে। রচনা ভেঙে ভেঙে দাম ঠিক হয় আর দরজার অসুখ করে উৎসর্গে ভাবের নাম দিই বলে...

১.
থার্ড পার্টটা ভালো করতে পারি না
প্রথমে তাড়াতাড়ি বলি
বুকে বসে থাকে সার্কাস
ঘন মাধ্যম লঘু মাধ্যম
প্রবল হবার দিকে এলেই
                পাল্টি খাই কাচগুঁড়ো সমেত

২.
উবু হয়ে রই
গণনা ভাগ হতে হতে
                          দুর্বল লাগে কভারে
এটা তোমার স্টাইলের জলসা
ফুটোমাথার খেল্
             সিলিকা ওড়াচ্ছে

(ছবিঃ ওরেস্ট জ্যিওমকো) 

আকাশপ্রদীপের কবিতা ১৬

Image result for abstract firework painting

মরচে পড়া খড়গ্
                         -স্বাগতা সিংহরায়


দেবতাকে উৎসর্গ করেছি যে উদ্যত খড়গ্
আমার বিশ্বাস-
সে আনন্দমঠ শোনেনি।
বিশেষ কোনো ঘরে -
  রাষ্ট্রীয় অহংকারে শোনা যায় তার হাহা..
কৃষ্ণবর্না দেবীর হাতে সুসজ্জিত
একের পর এক দুষ্টমুন্ড
  হাঁ করা শেয়াল গেলে রক্তের স্রোত..

আমি তার চরণ ছুঁয়েছি
পরীক্ষাদিনের প্রসাদী ফুলে কপালতিলক

মা...মা   গো...
এতযুগ পরে খড়গে কেন বিষ!
কে মাখালো গরলরহস্য!
মায়ের হাতে তবে কীসের বরাভয়
দুষ্টদমনে খড়গে্র চিরবিদায়।

অবসন্ন শিশুটি মাতৃপিতৃহীন-
ঘুমিয়ে পড়ে ক্ষুধার জঠরে
জন্মদিন থেকে তার যে শাক্যধর্ম!

(ছবিঃ নোয়া ইয়েরুশাল্মি)


আকাশপ্রদীপের কবিতা ১৫

Image result for red light abstract painting

শকুন
     -পাপড়ি গুহ নিয়োগী



আমি ও অশ্বত্থ দিব্যি তো আছি
কয়েক মাইল দূরে শুধু কথা... উৎসব
আহ্লাদের ডাকগুলো বুড়ো হয়
ভারী হয় নিঃশ্বাস, দীর্ঘ

 তারপর
গভীর ঘুমের মধ্যে দেখি
শত লোভী চোখ, খোঁজে
শকুন
আমারই শবদেহ

(ছবিঃ নেস্টর তোরো)  

আকাশপ্রদীপের অনুবাদ কবিতাঃ আলবানিয়া থেকে লিন্দিতা আরাপি

Image result for lindita arapi photo

গভীর জল
         -লিন্দিতা আরাপি

ঠিক  এইখানে একটা সেতুর দীঘল খিলান
এক দক্ষ শিল্পীর
 জলরঙের মতো
এর রঙ এখনো টাটকা।
এর অনেক নীচে, গভীরে
জল ডাকছে
নতুন আয়নার মতো লোভ আর উজ্জ্বলতা
যাতে আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমায়
আমি দেখছি, আগন্তুকের মতো প্রবল পিপাসা নিয়ে
সেটা ছুঁয়ে ফেলছে আমায়
আমি কেঁপে উঠছি
শ্বাস টেনে নিচ্ছি তার আত্মার অন্ধকারের ভিতর।
হে মৃত্যুর গভীরতা!
আমি আসছি। আমি আসছি
মধ্যবর্তী বাতাসে
ফেটে পড়া
গুলির মতো
আমি শুধু এই মুহুর্তটার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করেছি
বাতাসের শেষ বুদবুদের ওপর দুলে ওঠার জন্য
তোমার জেগে ওঠার ভেতর ডুবে যাওয়ার জন্য
আর আমার দিনের নতুন অর্থের জন্য


....................................................................................................................................

লিন্দিতা আরাপির জন্ম ১৯৭২ সালে। আলবানিয়ার লুশজেঁ শহরে। নব্বই দশক থেকে কর্মসূত্রে জার্মানিতে বসবাস। সে সময় থেকেই জার্মান ভাষায় লেখালেখির শুরু। মার্কিন অনুবাদক ক্যারোলিন ব্রাউনের ইংরেজি অনুবাদের মধ্যস্থতায় তাঁর কবিতার বঙ্গানুবাদ করা হল।

(ছবিঃ Heinrich Boll Stiftung)