Sunday, 16 June 2019

মেঘদূতের মাসের কবিতা ৬


বিশ্বাস করুন
                - জ্যোতির্ময় মুখার্জি


আমি সবকিছুই জমিয়ে রাখছি আমার হার্ডডিস্কে। জমতে জমতে হার্ডডিস্ক ফাঁকা। তোমাকে কিছু ধার দিয়েছিলাম। তুমি, যা কিছু ধার নিয়েছিলে। এসো ওলোটপালোট করি


হার্ডডিস্ক একটা মেঘের নাম। হার্ডডিস্ক একটা দোয়াতের’ও নাম। কালি বা কলম, যা কিছু তুমি মেঘ গোনো বা বৃষ্টি। আমি জমিয়ে নিয়েছি আমার হার্ডডিস্কে


হার্ডডিস্ক একটা জলযানের নাম। হার্ডডিস্ক একটা নদীর’ও নাম। এসো, নৌকা গড়ি। নৌকা ফাঁকা করি। ধার করি মেঘ। শোধ করি বৃষ্টি। ভেঙে ফেলি দোয়াত। ছড়িয়ে পড়ুক কালি। কমল লিখুক আমাকে। কলমে থেকো তুমি


বিশ্বাস করুন, আমি সবকিছুই জমিয়ে রাখছি আমার কলমে, জমতে জমতে আমার কলম ফাঁকা

মেঘদূতের মাসের কবিতা ৭


সুইসাইড নোট
                  - অনু সঞ্জনা ঘোষ



পুড়ে গেছে বালি। ঝরে ঝরে পড়েছে স্তূপ পর্বত। পড়তে পড়তে জমা ক্ষয় এখন আগুন। অরণ্য গভীর হলে বাঁধ ভেঙে ফেলে নদী। ভাঙা বাড়ী, ভাঙা ঘর। পোড়া কাঠে ভেসে যায় শুকনো উনোন। মা বালু গোছায়, বালুতে রাঁধে ভাত। হাসপাতাল হেঁটে চলে যায় বনের কাছে। তুমি জাঁকড়ে ধরো আমায়। স্মৃতি খুলে যায় গভীর ঘ্রাণে। ভাঙা বোতামে জড়িয়ে গেছি । চিৎকার করে বলতে চেয়েছি, হত্যাকারী তুমি। সুই সাইড নোট ভরে গেছে শান্ত বলয়ে। মৃত্যুর পর আবার বেঁচে উঠি আমি।

মা ভাত বেড়েছে বালিতে, একটাও কাকঁড় নেই পাতে....

মেঘদূতের মাসের কবিতা ৮


কাঁটাঝোপ 
             -সুমনা দত্ত

মৃত্যু শোক বোঝে না।
গাছ থেকে মন্ত্র খসে পড়ে অন্ধকারের মতো।

অগ্নিজলময় শশ্মানে এসে দাঁড়িয়েছি।
কাঁটাঝোপ সরিয়ে মুখ বাড়াছে হলুদ দাঁতের দাগ।

বাবা তুমিও বুঝি অন্ধকার ভালবাসতে?

মেঘদূতের মাসের কবিতা ৯



জেগে আছি...  বেঁচে আছি 
                                             -পিয়াল রায়


পোকাটা আমাকে গ্রাস করতে চাইছে
ওর গুঁড়ি মেরে এগিয়ে আসা টের পাচ্ছি
মাথার ভিতরটা অসম্ভব ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে
 টের পাচ্ছি অথচ চোখ খুলতে পারছি না পোকাটার রোমশ কন্টকিত শুঁড়,
দেহের সামনে পিছনে কর্ষিকা...
 উফফ কী বিভৎস থলথলে !
দুটো চোখে একটুও খোলা জায়গা নেই
যেখান দিয়ে আলো আসতে পারে যেতে পারে
 পোকাটার মনের অবিরাম অস্থিরতা তাকে
 টেনে নিয়ে যাচ্ছে কোনো অচেনা দুর্যোগের দিকে
আমি বুঝতে পারছি কিন্তু আগামী থেকে
 ভেসে আসা কোনো বার্তা যা জীবনকে
 গুনেগেঁথে নিতে অভ্যস্ত, তাকে বোঝাতে পারছি না
চোখ খুলতে না পারার অসহায়তা আমাকে ডুবিয়ে মারছে
মৃত্যুতে আমি ভীত নই
 আমি ভয় পাচ্ছি, এই বোধটাই আমাকে শেষ
 করে দিতে চাইছে ভিতরে ভিতরে

 পোকাটা বিষাক্ত
 তারচেয়েও ভয়াবহ হল ও বিষের অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল
 এতটাই যে ওর শরীর থেকে বেরিয়ে আসা
 বদগন্ধ একটু উঁচুতে তুলে ধরলেই নাশ হতে
 পারে লৌহগোলোকও
 এসব নিখুঁত পরিকল্পনা
 আমি জানতাম ওর অস্তিত্বকে অস্বীকার
 করাটাই একমাত্র মেরে ফেলতে পারে ওকে
 আসন্ন এই সময়ে দাঁড়িয়ে জপ করতে থাকি
 আমার যুগ যুগ ধরে বহমান আস্থার
 ধ্বনিটিকে
 আমার সমগ্র জীবন, আমার স্বেচ্ছাকৃত
 আনন্দপ্লাবন আমি সমর্পণ করি নিভৃত এক ছায়ার
 কাছে
ধ্যানমৌন সে বুদ্ধের নামে উৎসর্গ করি আমার উচ্চারণসকল
সুতোর মতো জড়িয়ে নিতে থাকি পায়ের নিচের সজীব দূর্বাদল
 আরো একটু শ্বাস নিই খোলা আকাশের
 মেঘ,ধান, প্রজাপতির গন্ধে ঢাকা পড়ে যায়
 অর্থহীন খোঁয়াড়ি

মেঘদূতের মাসের কবিতা ১০



প্রেম পর্যায়ের কবিতা 
                            -রঙ্গন রায়

রবি ঠাকুরের গানের কাছে এসে মাতালেরা অ্যাশট্রে ঝেড়ে ফেললে
 রাস্তায় হাঁটা মাতালের পুরোনো সেই দিনের কথা মনে পড়ে  ;
কী তফাৎ দুজনের ভেতর? কী তফাৎ ওদের সাথে আমার ?
রোজ রাতে ক্রমশ ঘোরের মধ্যে চলে যাই , ছাই পড়ে থাকে লেখার খাতায় -
কেন এখনো প্রতিটি পুরুষ কাঁদতে এত লজ্জা পায়?
কেন এখনো রাত সাড়ে দশটায় মোবাইল খুলে বসে থাকি রোজ !
প্রেম তো বুঝে গেছি নিজের মত করে , আর কিসের প্রয়োজন হে!
কিসেরই বা অপেক্ষা!
অভ্যাস বশে কেউ  বৃষ্টির রাস্তায় নৌকা ভাসিয়ে দিলে কেন এখনো
আমার উঠোনে জল দাঁড়িয়ে যায়?  

মেঘদূতের মাসের কবিতা ১১



স্নান
       -পায়েলী ধর

খুলে রাখো ঝঞ্ঝা ও ঝড়
রোদসেঁকা বেপথু পালক
আমাদের সব দরজারা
যুগপৎ নদী ও আগুন
শেকলের ধার মেপেজুকে
সেইখানে নিভে আসে স্বর
ডাকনাম তার জানি শোক
আহৃদয় আঁচড়ের দাগ
সমস্ত উপশমে লিখো
আকাশ  : ধোঁয়াশা আর মিথ
দেখো চোখ প্রগলভ হবে
স্বাদু জল নোনারঙা হ্রদ
সে'রঙের বিশেষণ-আলো
অতলের মাটি খুঁড়ে রাখে
অসহায় জ্বরে পোড়ে বাড়ি
ঘুড়ির সুতোর মতো একা
এখনই তো অবসর ভেঙে
একঘর ঘড়ি ভিজে যাবে
হেরে যাই তবু লেগে থাকে
ঠোঁটে-ঠোঁটে মুক্তোচুমুক...

                             

Saturday, 25 May 2019

অনুবাদঃ আসামের ডিমাসা কবিতা

Image result for may day in painting

কুলেন্দ্র ডাউলাগুফু


সিপাহি পত্নীর ব্যথা  : একটি পত্র 


আজ মেঘলা দিনে
ভীষণ  মনে পড়ছে তোমাকে আমার
ডিয়ুং-এর এই উজান থেকে।
ডিয়ুং নদী পেরিয়ে,  হায়ুং পাহাড় ডিঙিয়ে
পৌছবে কি পৌছবে না
আমার চিন্তার বার্তা এখান থেকে?
আমি কোথায় তুমি কোথায় -
এমন হল কিসের জন্য?


পিছনে তাকালে
মনে পড়ে, নিঃশেষিত হাওয়া
আনন্দে গাওয়া সে দিনগুলো,
শেষ -হয়ে -যাওয়া
হাসিখুশিতে নাচা সে রাতগুলো!
হৃদয় ব্যথায় ভরে যায় সেদিনকার কথাগুলো ভাবলে
বড় দুঃখ হয় সেদিনকার স্মৃতিগুলো স্মরণ করলে!

ওয়াকু গ্রামের তুমি যুবকদের নেতা আমি যুবতীদের নেত্রী
থাকার দিনে
আমরা
হরিণের মত ছিলাম, নেচে দৌড়ে
ছিলাম,প্রজাপতির মত উড়ে- উড়ে
খেটে খাবো বলে হয়েছিল ভালোবাসা
কাপড় বুনে পরব বলে বেঁধেছিলাম ঘর ও।
তবুও
সময় যায় বদলে—ভাবার মত হয় না এ পৃথিবীতে।
জুম ক্ষেতে ফলে না ফসল
জাল ফেলে মেলে না মাছ
হরিণ শিকারে মেলে না হরিণ
শ্রমের বিনিময়ে মেলে না শ্রম
পেট ভরে ভাত খেতে পাই না, আমাদের এই রাজ্যে।
একদিন
সংসারের মাঝদরিয়ায় আমাকে একা রেখে,
দূরের পথে গেলে চলে তুমি সিপাহি হয়ে
সোনালী দিন আসবে ভেবে, রুপোলী রাত আনবে বলে,


তুমি চলে গেলে রণাঙ্গনে
আমি রইলাম চোখ ভরা অশ্রু নিয়ে!


তুমি চলে গেলে
আর এখন, তোমার গ্রাম পড়ছে মরছে
আমাদের ঘরের ছোট বাগান
গেছে ভরে কাঁটা ঝোপঝাড়ে।
রোজই ভাত খাবার সময় একটি থাল থেকে যায় অতিরিক্ত
চুল আঁচড়ানোর সময় চিরুনির সংগে লেগে আসা পাকা চুল
তুমি নেই
আমার পৃথিবী অন্ধকার—রাত, দিন ও রাত—চাঁদকে দেখিনা রাতে ও
নিজের ছায়াই হচ্ছে আমার সাথী, থাকার জন্য একা রোজ।
ঘুমেও কাটাতে পারিনা রাত, কাজেও শেষ হয়না দিন—
কী ভাগ্য নিয়ে এসেছি আমরা
জানিনা আমি।


আজ ভোরে
শরীর ভীষণ শিরশির করে ওঠে
গ্রামের বাড়িতে পেঁচার ডাক শুনে,
আমার চোখ ফুলে উঠছে তোমার কথা ভেবে ভেবে!
দূরদেশে গিয়েছ রণাঙ্গনে- খারাপ কিছু কি যায় ঘটে
ভয়ে বিহ্বল আমার হৃদয়— কোনো বিপদ হবে না তো!


তুমি এস ফিরে, তাড়াতাড়ি!
তুমিই মাঝদরিয়ায় মহাপাথর
তুমিই মাঝপথের মহাগাছ,
চাইনে আমার সোনার বালা,চাইনে রুপোর মালা,
তুমি নেই আমি ও নেই, তুমি থাকলেই আমি ও থাকব
শীঘ্র ফিরে এস, ধানের বীজ বপন করবে এসে— পৃথিবী গোল


মূল ডিমাসা থেকে অনুবাদ- বিশ্বজ্যোতি বর্মণ


ছবিঃ কাসান্দ্রা তন্দ্রো